← All stories

একা, লঞ্চে, কম বাজেটে কুয়াকাটা: সাড়ে আট হাজার টাকায় তিন দিন

JajaborKuakata28 Nov 2025
একা, লঞ্চে, কম বাজেটে কুয়াকাটা: সাড়ে আট হাজার টাকায় তিন দিন

নভেম্বরের এক সপ্তাহে আমি একাই কুয়াকাটা ঘুরে এলাম, তিন দিন দুই রাতের ট্রিপ। যাওয়ার রাতটা কেটেছে লঞ্চে, আর পুরো ট্রিপে খরচ হয়েছে সাড়ে আট হাজার টাকার মতো। একা ঘুরতে যাওয়ার কথা বললে বাসার লোকজন একটু চিন্তায় পড়ে যায়। তাই আমি এমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছিলাম যেটা নিরাপদ, পরিচিত, আর যেখানে একা গেলেও খরচ খুব বেশি পড়ে না। কুয়াকাটা সেই হিসেবে একদম ঠিক ছিল। আর আমার অনেকদিনের শখ ছিল সদরঘাট থেকে লঞ্চে রাত কাটানোর। তাই ঠিক করলাম, যাব লঞ্চে, ফিরব বাসে।

যাওয়া: সদরঘাট থেকে লঞ্চে এক রাত

সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে পটুয়াখালীগামী লঞ্চে উঠলাম। দুই দিন আগে ফোন করে একটা সিঙ্গেল কেবিন বুক করে রেখেছিলাম। একা হলে ডেকেও যাওয়া যায়, খরচ অনেক কম, কিন্তু রাতে ব্যাগ নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জন্য কেবিনটাই ভালো মনে হয়েছে। লঞ্চ ছাড়ার পর বুড়িগঙ্গা থেকে বের হয়ে বড় নদীতে পড়তেই বাতাস বদলে যায়। রাতে লঞ্চের ক্যান্টিনে ভাত, ডাল আর ইলিশ ভাজা খেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত ডেকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভোরে পটুয়াখালী ঘাটে নেমে লোকাল বাসে প্রায় দুই ঘণ্টায় কুয়াকাটা।

থাকা: বাজেট হোটেল, কিন্তু সৈকতের কাছে

আমি আগে থেকে হোটেল বুক করিনি, কারণ নভেম্বরের সাধারণ সপ্তাহে ভিড় কম থাকে। সৈকত থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটার দূরত্বে একটা বাজেট হোটেলে রুম পেয়ে গেলাম। রুম সাধারণ, কিন্তু পরিষ্কার, গরম পানি আছে। একা ভ্রমণে এর বেশি দরকারও নেই, কারণ রুমে শুধু ঘুমাতে যাব। তবে সতর্ক থাকবেন: ছুটির দিন বা শীতের ডিসেম্বরে গেলে অবশ্যই আগে বুক করবেন।

প্রথম দিন: সৈকত আর সূর্যাস্ত

দুপুরে ঘুম দিয়ে উঠে বিকেলে সৈকতে হাঁটা শুরু করলাম। কুয়াকাটার সৈকত কক্সবাজারের মতো ভিড় না, অনেক জায়গায় হাঁটতে হাঁটতে একদম একা হয়ে যাওয়া যায়। ঝাউবন পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে ফিরে এসে মূল সৈকতে সূর্যাস্ত দেখলাম। সন্ধ্যায় সৈকতের দোকানে মাছ বেছে নিয়ে ফ্রাই করিয়ে খেলাম। আমি একটা কাঁকড়া আর একটা মাঝারি রূপচাঁদা নিয়েছিলাম। কেনার আগে দাম আর ওজন ঠিক করে নিয়েছিলাম, এটা খুব জরুরি।

দ্বিতীয় দিন: বাইকে পুরো কুয়াকাটা

আগের রাতে একজন মোটরবাইকচালকের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। ভোর সাড়ে পাঁচটায় তিনি হোটেলের সামনে হাজির। প্রথমে গঙ্গামতির চরে সূর্যোদয়। সমুদ্রের ভেতর থেকে সূর্য ওঠা দেখা, আর একই সৈকতে আগের সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখা, কুয়াকাটার আসল বিশেষত্ব এটাই। এরপর সৈকত ধরে বাইকে লাল কাঁকড়ার চর। আমাদের বাইকের শব্দে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া একসাথে গর্তে ঢুকে যাচ্ছিল, দেখার মতো দৃশ্য।

নাশতা সেরে গেলাম মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধ বিহারে, এখানে বিশাল একটা বুদ্ধমূর্তি আছে। পাশের রাখাইন পল্লীতে তাঁতের কাপড় তৈরি দেখলাম, একটা গামছা কিনলাম। দুপুরের পর শেয়ার্ড নৌকায় ফাতরার বনে গেলাম। এটা ছোট একটা ম্যানগ্রোভ বন, সুন্দরবনের মতো বিশাল নয়, কিন্তু অল্প সময়ে ম্যানগ্রোভ বন দেখার জন্য ভালো। বিকেলে শুঁটকি পল্লী ঘুরে হোটেলে ফিরলাম।

তৃতীয় দিন: ফেরা

সকালে আরেকবার সৈকতে হাঁটলাম, তারপর সরাসরি ঢাকার নন-এসি বাসে উঠলাম। পদ্মা সেতু হয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই ঢাকা পৌঁছে গেছি। যাওয়ার সময় লঞ্চ, ফেরার সময় বাস, দুই রকম অভিজ্ঞতাই হলো।

খরচের হিসাব

  • সদরঘাট–পটুয়াখালী লঞ্চ, সিঙ্গেল কেবিন: ১,৫০০ টাকা
  • পটুয়াখালী–কুয়াকাটা লোকাল বাস: ২০০ টাকা
  • কুয়াকাটা–ঢাকা নন-এসি বাস: ৯০০ টাকা
  • বাজেট হোটেল, দুই রাত (১,২০০ × ২): ২,৪০০ টাকা
  • মোটরবাইক, প্রায় পুরো দিন: ১,২০০ টাকা
  • ফাতরার বনে শেয়ার্ড নৌকা: ৩০০ টাকা
  • খাবার, লঞ্চসহ তিন দিন (কাঁকড়া ও মাছ ফ্রাইসহ): ১,৫০০ টাকা
  • অন্যান্য (গামছা, চা, ইজিবাইক): ৫০০ টাকা

মোট: ৮,৫০০ টাকা

লঞ্চে ডেকে গেলে আর বাইক অন্য কারও সাথে শেয়ার করলে খরচ আরও দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কমানো যায়।

যারা একা যেতে চাও, তাদের জন্য আমার পরামর্শ

  • লঞ্চে যেতে চাইলে কেবিন আগে থেকে বুক করো, বিশেষ করে বৃহস্পতিবার।
  • বাইকচালকের সাথে আগের রাতেই কোন কোন স্পট আর কত টাকা, সব ঠিক করে নাও।
  • সৈকতের দোকানে মাছ কেনার আগে দাম ও ওজন নিশ্চিত হয়ে নাও।
  • একা সাগরে বেশি দূরে নেমো না, জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নাও।
  • হোটেলের ঠিকানা আর বাইকচালকের নম্বর বাসার কাউকে জানিয়ে রাখো।
Share this story

More stories

View all stories