দুই বাচ্চা নিয়ে সুন্দরবনে লঞ্চে তিন দিন: যেমন ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক ভালো
গত ডিসেম্বরে স্কুলের ছুটিতে আমরা চারজন, মানে আমি, আমার স্ত্রী, এগারো বছরের ছেলে আর সাত বছরের মেয়ে, সুন্দরবন ঘুরে এলাম। খুলনায় এক রাত আর লঞ্চে তিন দিন দুই রাত মিলিয়ে মোট চার দিনের ট্রিপ, পুরো পরিবারের খরচ হয়েছে প্রায় সাতান্ন হাজার টাকা। যাওয়ার আগে সুন্দরবনের কথা বললে সবার প্রথম প্রশ্ন ছিল, "বাচ্চা নিয়ে? নিরাপদ তো?" সত্যি বলতে আমারও একই চিন্তা ছিল। তিন দিন লঞ্চে থাকা, বনের ভেতরে হাঁটা, ছোট মেয়েটা পারবে কিনা। ফিরে এসে বলতে পারি, ভালো একটা ট্যুর অপারেটরের সাথে গেলে বাচ্চাদের জন্য এর চেয়ে শিক্ষামূলক ভ্রমণ আর হয় না। আমার ছেলে এখনো স্কুলে সবাইকে হরিণ আর কুমিরের গল্প করে।
প্যাকেজ বাছাই: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
সুন্দরবনের ভেতরে নিজে নিজে যাওয়া যায় না, বন বিভাগের অনুমতি আর সশস্ত্র বনরক্ষী লাগে। তাই প্যাকেজই একমাত্র উপায়। আমি চার-পাঁচটা অপারেটরের সাথে কথা বলেছিলাম। দাম দেখে নয়, তিনটা জিনিস দেখে বাছাই করেছি: লঞ্চে অ্যাটাচড বাথরুমসহ কেবিন আছে কিনা, বাচ্চাদের মাপের লাইফ জ্যাকেট আছে কিনা, আর আগে যারা গিয়েছে তাদের রিভিউ। প্রায় দেড় মাস আগে বুক করেছিলাম, কারণ ডিসেম্বরে ভালো লঞ্চগুলো দ্রুত বুক হয়ে যায়। বুকিংয়ের সময় সবার জাতীয় পরিচয়পত্র আর বাচ্চাদের জন্মনিবন্ধনের কপি দিতে হয়েছিল অনুমতিপত্রের জন্য।
যাওয়া: ট্রেনে খুলনা
পদ্মা সেতু হওয়ার পর খুলনা যাওয়া এখন অনেক সহজ। আমরা আগের দিন সকালের ট্রেনে খুলনা গিয়েছিলাম, যাতে বাচ্চারা রাতে ভালো ঘুমিয়ে পরদিন লঞ্চে উঠতে পারে। খুলনায় একটা মাঝারি মানের হোটেলে উঠলাম। দুপুরে খুলনার বিখ্যাত চুইঝাল দিয়ে খাসির মাংস খেলাম। ঝাল একটু বেশি, কিন্তু স্বাদ অসাধারণ। বাচ্চাদের জন্য আলাদা কম ঝালের তরকারি নিয়েছিলাম।
লঞ্চের তিন দিন: কীভাবে কাটল
সকালে খুলনা ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ল। প্রথম দিন পুরোটাই প্রায় নদীপথে, পশুর নদী ধরে দক্ষিণে। বাচ্চারা ডেকে বসে দুপাশের বন দেখছিল আর গাইড আঙ্কেলকে একের পর এক প্রশ্ন করছিল। দুপুরের খাবার লঞ্চেই, নদীর টাটকা মাছ, চিংড়ি আর মুরগি। খাবারের মান আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল। বিকেলে হারবাড়িয়ায় নেমে কাঠের ট্রেইলে হাঁটলাম। সন্ধ্যায় লঞ্চ একটা খালের মুখে নোঙর ফেলল। রাতে ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার পর চারপাশের নিস্তব্ধতা আর বনের শব্দ, সেটা আমার স্ত্রীর সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত।
দ্বিতীয় দিন সবচেয়ে ব্যস্ত। ভোরে ছোট নৌকায় করে সরু খালে ঢুকলাম। এটাই সুন্দরবনের আসল রূপ: দুপাশে শ্বাসমূল, গাছে মাছরাঙা, কাদায় লাফানো ছোট মাছ। এরপর কটকায় নামলাম। এখানে হরিণের দল দেখে আমার মেয়ে এত খুশি যে চুপ করানোই যাচ্ছিল না। ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারপাশের বন দেখলাম। তারপর জামতলা সৈকতে হাঁটা, যেখানে বন এসে মিশেছে সমুদ্রে। বিকেলে কচিখালীতে বানরের দল আর বিশাল ঘাসবন। এক জায়গায় কাদায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখিয়েছিলেন গাইড, বাঘ দেখা হয়নি, কিন্তু ওই ছাপ দেখেই আমার ছেলের রোমাঞ্চ ছিল দেখার মতো।
তৃতীয় দিন ফেরার পথে করমজলে থামলাম। এখানে কুমির প্রজনন কেন্দ্রে বিভিন্ন বয়সের কুমির আর কচ্ছপ দেখা যায়, বাচ্চাদের জন্য পুরো ট্রিপের অন্যতম সেরা জায়গা। সন্ধ্যার আগে খুলনা ঘাটে ফিরলাম, রাতের ট্রেনে ঢাকা।
খরচের হিসাব (চারজনের পরিবার)
- ৩ দিন ২ রাতের লঞ্চ প্যাকেজ: দুজন প্রাপ্তবয়স্ক (১২,০০০ × ২): ২৪,০০০ টাকা
- ৩ দিন ২ রাতের লঞ্চ প্যাকেজ: দুই শিশু, ছাড়সহ (৯,০০০ × ২): ১৮,০০০ টাকা
- ঢাকা–খুলনা ট্রেন, এসি চেয়ার (চারজন, আসা-যাওয়া): ৭,৬০০ টাকা
- খুলনায় হোটেল, এক রাত: ৩,০০০ টাকা
- খুলনায় খাবার (চুইঝালসহ): ১,৮০০ টাকা
- সুন্দরবনের মধু কেনা: ১,২০০ টাকা
- অন্যান্য (যাতায়াত, গাইড ও লঞ্চকর্মীদের বখশিশ): ১,৫০০ টাকা
মোট: ৫৭,১০০ টাকা
প্যাকেজে লঞ্চে থাকা, তিন বেলা খাবার, বনে প্রবেশের অনুমতি, গাইড ও বনরক্ষী অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্যাকেজের দাম লঞ্চের মান ও কেবিনের ধরন অনুযায়ী বেশ কম-বেশি হয়।
বাচ্চা নিয়ে যারা যাবেন, তাদের জন্য আমার পরামর্শ
- প্যাকেজ বাছাইয়ে বাচ্চাদের মাপের লাইফ জ্যাকেট আর অ্যাটাচড বাথরুম আছে কিনা আগে নিশ্চিত হোন।
- লঞ্চে ওঠার আগের দিন খুলনায় পৌঁছে বিশ্রাম নিন, বাচ্চারা অনেক ঝরঝরে থাকবে।
- মশা তাড়ানোর ক্রিম, টর্চ, একটা দূরবিন আর বাচ্চাদের জন্য হালকা গরম কাপড় নিন। ডিসেম্বরে নদীর বাতাস ঠান্ডা।
- বাচ্চাদের উজ্জ্বল রঙের জামা না পরিয়ে সবুজ বা বাদামি রঙের জামা পরান।
- বনে নামার সময় বাচ্চাদের হাত সবসময় ধরে রাখুন আর গাইডের পেছনে থাকুন।
- জুন থেকে আগস্ট সুন্দরবনে পর্যটন বন্ধ থাকে, সেপ্টেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে প্ল্যান করুন।