অফিসের ক্লান্তি ঝাড়তে শ্রীমঙ্গলে আমাদের দুজনের এক উইকেন্ড
বছরের শেষ কয়েক মাস আমার আর আমার স্ত্রীর, দুজনেরই অফিসে প্রচণ্ড চাপ গেছে। তাই জানুয়ারির এক শুক্রবার সকালে হঠাৎ ঠিক করলাম, এই উইকেন্ডে কোথাও যাব, কিন্তু এমন জায়গায় যেখানে দৌড়াদৌড়ি নেই, শুধু বিশ্রাম। হিসাব করে দেখলাম শ্রীমঙ্গলই সবচেয়ে ভালো: ট্রেনে কয়েক ঘণ্টা, চারপাশে সবুজ, আর দুই দিন এক রাতেই যথেষ্ট। শীতের সেই উইকেন্ডে দুজনের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে তেরো হাজার টাকা, যার বড় অংশ গেছে চা-বাগানের পাশের রিসোর্টে। কীভাবে কাটালাম, নিচে পুরোটা লিখছি।
যাওয়া: ট্রেনটাই ট্রিপের অর্ধেক মজা
অনলাইনে আগের রাতে সিলেটগামী সকালের আন্তঃনগর ট্রেনের শোভন চেয়ারের টিকিট পেয়ে গেলাম। কমলাপুর থেকে ট্রেন ছাড়ল সকালে, শ্রীমঙ্গল পৌঁছালাম দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে। ভৈরব পার হওয়ার পর থেকে জানালার বাইরের দৃশ্য বদলে যেতে থাকে, আর শ্রীমঙ্গলের কাছাকাছি এসে দুপাশে চা-বাগান শুরু হয়। আমার স্ত্রী পুরো রাস্তা জানালার পাশে বসে ছিল, ফোন একবারও বের করেনি।
প্রথম দিন: রিসোর্ট, চা-বাগান আর সাত রঙের চা
আমরা শহর থেকে একটু বাইরে চা-বাগানের পাশে একটা রিসোর্টে উঠেছিলাম। শহরের হোটেলে খরচ অর্ধেক হতো, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যই ছিল নিরিবিলি থাকা, তাই এখানে বাজেট বাড়াতে আপত্তি করিনি। রুমের বারান্দা থেকে সরাসরি চা-বাগান দেখা যায়, আর সন্ধ্যার পর চারপাশ একদম নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝির ডাক।
স্টেশনে নেমেই একজন সিএনজিচালকের সাথে পরের দিনের পুরো দিনের ভাড়া ঠিক করে নিয়েছিলাম। প্রথম দিন বিকেলে তিনিই আমাদের আশপাশের চা-বাগানে ঘুরিয়ে নিলেন। সন্ধ্যায় গেলাম সাত রঙের চা খেতে। এক গ্লাসে সাতটা আলাদা রঙের স্তর, দেখতে যতটা মজার, খেতে ঠিক ততটা আহামরি না। কিন্তু শ্রীমঙ্গল গিয়ে এটা না খেলে লোকে বিশ্বাসই করবে না যে গিয়েছিলে। এর চেয়ে আমার বেশি ভালো লেগেছে সাধারণ দুধ-চা, স্থানীয় পাতার স্বাদটাই আলাদা।
রাতে রিসোর্টেই খেলাম। ওরা সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস রান্না করে দিয়েছিল। সাতকরা সিলেট অঞ্চলের এক ধরনের টক লেবুজাতীয় ফল, মাংসে একটা সুগন্ধি টক স্বাদ আসে। এটা অবশ্যই খেয়ে দেখবেন।
দ্বিতীয় দিন: লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক আর ফেরা
সকাল আটটায় সিএনজি চলে এলো। প্রথমে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রবেশপথে টিকিট কেটে একজন গাইড নিলাম। গাইড নেওয়াটা খুব কাজে দিয়েছে। তিনি জানতেন উল্লুক কোথায় থাকে, আর সত্যিই আমরা গাছের ওপরে উল্লুকের একটা পরিবার দেখতে পেয়েছিলাম। একা গেলে হয়তো খেয়ালই করতাম না। আমরা ঘণ্টাখানেকের ট্রেইলে হেঁটেছিলাম। বনের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইনটাও দেখলাম, ছবি তোলার জন্য দারুণ জায়গা।
এরপর কমলগঞ্জ হয়ে মাধবপুর লেক। লেকটা একটা চা-বাগানের ভেতরে, চারপাশে টিলা। শীতকাল বলে শাপলা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু টিলার ওপর থেকে লেক আর চা-বাগানের দৃশ্য অসাধারণ। এখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটিয়েছি, কোনো তাড়া ছিল না। ফেরার পথে মণিপুরি পল্লীতে থামলাম। আমার স্ত্রী সেখান থেকে একটা মণিপুরি তাঁতের শাল কিনল।
দুপুরে শহরে ফিরে খেয়ে স্টেশন থেকে বিকেলের ট্রেনে ঢাকা। রাত দশটার মধ্যে বাসায়। মাত্র দেড় দিনের ট্রিপ, কিন্তু রবিবার অফিসে গিয়ে মনে হচ্ছিল এক সপ্তাহ ছুটি কাটিয়ে এসেছি।
খরচের হিসাব (দুজন মিলিয়ে)
- ঢাকা–শ্রীমঙ্গল ট্রেন, শোভন চেয়ার (দুজন, আসা-যাওয়া): ১,৩০০ টাকা
- চা-বাগানের পাশের রিসোর্ট, এক রাত, নাশতাসহ: ৫,৫০০ টাকা
- সিএনজি, প্রথম দিন বিকেল ও দ্বিতীয় দিন পুরো দিন: ২,৫০০ টাকা
- লাউয়াছড়ার টিকিট ও গাইড: ৭০০ টাকা
- খাবার ও চা (দুই দিন): ২,২০০ টাকা
- মণিপুরি শাল ও চা-পাতা কেনা: ১,৩০০ টাকা
মোট: ১৩,৫০০ টাকা
শহরের হোটেলে থাকলে মোট খরচ প্রায় ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা কমে যাবে।
যারা যাবে, তাদের জন্য আমার পরামর্শ
- ট্রেনের টিকিট অনলাইনে যত আগে সম্ভব কাটুন, উইকেন্ডে দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
- স্টেশনে নেমেই পুরো দিনের সিএনজি ঠিক করে নিন, আলাদা আলাদা ভাড়ায় ঘুরলে খরচ বেশি পড়ে।
- লাউয়াছড়ায় অবশ্যই গাইড নিন, বন্যপ্রাণী দেখার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
- শাপলা দেখতে চাইলে মাধবপুর লেকে বর্ষা বা শরতে যান, শীতে কম থাকে।
- শীতে সকাল-সন্ধ্যা বেশ ঠান্ডা, হালকা গরম কাপড় নিন।