ছয় বন্ধু, তিন দিন, সাড়ে সাত হাজার টাকা: আমাদের সাজেক ট্রিপের পুরো হিসাব
আগস্টের শেষ সপ্তাহে, বর্ষার একদম মাঝামাঝি সময়ে, আমরা ছয় বন্ধু মিলে তিন দিনের জন্য সাজেক ঘুরে এলাম। দুই রাত কেটেছে বাসে, আর এক রাত সাজেকের এক কাঠের কটেজে। সবকিছু মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা। ফেরার পর থেকেই অনেকে জিজ্ঞেস করছে সাজেক যেতে আসলে কত লাগে, কীভাবে প্ল্যান করব, তাই ঠিক করলাম পুরো ট্রিপটা গুছিয়ে লিখে ফেলি। আমরা ছয়জনই চাকরি করি, তাই বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিয়ে রবিবার সকালে সরাসরি অফিসে ঢোকার প্ল্যান ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে, ছুটি নিতে হয়েছে মাত্র এক দিন।
প্ল্যানিং: যেটা আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম
দুটো জিনিস আমরা দুই সপ্তাহ আগেই কনফার্ম করেছিলাম: বাসের টিকিট আর সাজেকের কটেজ। বর্ষায় সাজেকে প্রচণ্ড ভিড় হয়, শুক্রবার রাতে ভ্যালি ভিউ রুম পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমরা রুইলুই পাড়ায় একটা কাঠের কটেজে দুটো রুম নিয়েছিলাম, প্রতিটায় তিনজন। ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছিলাম যে বারান্দা উপত্যকার দিকে। আর খাগড়াছড়ির এক জিপ ড্রাইভারের নম্বর এক বন্ধুর কাছ থেকে নিয়ে আগেই রিজার্ভ করে রেখেছিলাম, যাতে সকালে স্ট্যান্ডে গিয়ে দরদাম করতে না হয়।
প্রথম দিন: খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে দশটায় সায়েদাবাদ থেকে নন-এসি বাসে উঠলাম। রাস্তা মোটামুটি ভালো, ভোর ছয়টার একটু পরে খাগড়াছড়ি শহরে নামলাম। ড্রাইভার মামা আগেই চলে এসেছিলেন। শহরের একটা হোটেলে পরোটা, ডিম আর ডাল দিয়ে নাশতা সেরে রওনা দিলাম।
প্রথম স্টপ ছিল আলুটিলা গুহা। টিকিট কেটে মশাল নিয়ে গুহার ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরে অন্ধকার, পায়ের নিচে ঠান্ডা পানি বয়ে যাচ্ছে। একটা পরামর্শ: স্যান্ডেল পরে যাবে, কেডস ভিজে একাকার হবে। আমাদের একজন কেডস পরে গিয়েছিল, বাকি দুই দিন তাকে ভেজা জুতা নিয়েই ঘুরতে হয়েছে।
এরপর দীঘিনালা হয়ে বাঘাইহাট। এখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে সব গাড়ি একসাথে জড়ো হয়, তারপর এসকর্টের সাথে সাজেকে যায়। আমরা সকালের এসকর্ট ধরতে পেরেছিলাম। ড্রাইভার মামা বলছিলেন, অনেকে দেরি করে পৌঁছে এসকর্ট মিস করে, তখন দুপুর পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। তাই খাগড়াছড়ি থেকে সকাল সাতটার মধ্যে বের হয়ে যাওয়াই নিরাপদ। বাঘাইহাট থেকে সাজেকের রাস্তাটা পুরো ট্রিপের সেরা অংশ। খোলা জিপের ছাদে দাঁড়িয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, প্রতিটা বাঁকে নতুন দৃশ্য। রাস্তার পাশে বাচ্চারা হাত নাড়ছিল, আমরাও নাড়ছিলাম।
দুপুর একটার দিকে সাজেক পৌঁছে কটেজে চেক-ইন করলাম। ব্যাগ রেখেই প্রথম কাজ: দুপুর আর রাতের খাবারের অর্ডার দেওয়া। সাজেকের রেস্টুরেন্টগুলো অর্ডার নিয়ে রান্না করে, আগে না বললে পরে খাবার পাওয়া কঠিন। রাতের জন্য ব্যাম্বু চিকেন আর বারবিকিউ অর্ডার দিলাম।
বিকেলে হেলিপ্যাডে গেলাম সূর্যাস্ত দেখতে। বর্ষা বলে আকাশ পুরো পরিষ্কার ছিল না, কিন্তু মেঘ আর রোদের খেলায় যে আলো তৈরি হলো, সেটা ক্যামেরায় ধরে রাখা কঠিন। সন্ধ্যার পর কটেজের বারান্দায় বসে আড্ডা, তারপর ব্যাম্বু চিকেন। বাঁশের ভেতরে রান্না হওয়ায় মাংসে একটা আলাদা ঘ্রাণ থাকে। আমরা ছয়জন মিলে দুটো অর্ডার দিয়েছিলাম, পরে মনে হয়েছে তিনটা দেওয়া উচিত ছিল।
দ্বিতীয় দিন: ভোরের কংলাক আর ফেরা
ভোর পাঁচটায় অ্যালার্ম। কংলাক পাহাড়ে উঠতে রুইলুই পাড়া থেকে হেঁটে প্রায় আধঘণ্টা লাগে, শেষ অংশটা খাড়া। উপরে উঠে যা দেখলাম, সেটার জন্যই আসলে সাজেক যাওয়া। পুরো উপত্যকা সাদা মেঘে ঢাকা, আমরা দাঁড়িয়ে আছি তার ওপরে। প্রায় এক ঘণ্টা ছিলাম, কেউ নামতে চাচ্ছিল না।
কটেজে ফিরে নাশতা করে দশটার মধ্যে চেক-আউট, কারণ ফেরার এসকর্টও নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়ে। ফেরার পথে রিসাং ঝর্ণায় থামলাম। বর্ষায় ঝর্ণায় পানি অনেক, পাথর পিচ্ছিল, তাই সাবধানে নামতে হয়। বিকেলে খাগড়াছড়ি শহরে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু ঘোরাঘুরি, তারপর রাত নয়টার বাসে ঢাকা। রবিবার ভোরে ঢাকা পৌঁছে বাসায় গোসল করে সোজা অফিস।
খরচের হিসাব (জনপ্রতি)
- ঢাকা–খাগড়াছড়ি নন-এসি বাস (আসা-যাওয়া): ১,৬৫০ টাকা
- জিপ রিজার্ভ, আসা-যাওয়া ও পথের স্পট মিলিয়ে (মোট ১২,৫০০ ÷ ৬): ২,০৮০ টাকা
- কটেজ, এক রাত (দুই রুম মোট ৮,০০০ ÷ ৬): ১,৩৩০ টাকা
- খাবার, ব্যাম্বু চিকেন ও বারবিকিউসহ তিন দিন: ১,৮০০ টাকা
- আলুটিলা ও রিসাংয়ের টিকিট, মশাল, প্রবেশ ফি: ২৫০ টাকা
- অন্যান্য (চা, পানি, ফল, বখশিশ): ৩০০ টাকা
মোট: ৭,৪১০ টাকা
দল যত বড়, জিপ আর কটেজের খরচ তত ভাগ হয়ে কমে যায়। চারজন গেলে জনপ্রতি খরচ প্রায় ২,০০০ টাকা বেশি পড়বে।
যারা যাবে, তাদের জন্য আমার পরামর্শ
- কটেজ আর জিপ আগে থেকে কনফার্ম করে যাও, বিশেষ করে বৃহস্পতি-শুক্রবার।
- খাগড়াছড়ি থেকে সকাল সাতটার মধ্যে বের হও, যাতে বাঘাইহাটের এসকর্ট মিস না হয়।
- সাজেকে পৌঁছেই সব বেলার খাবারের অর্ডার দিয়ে দাও।
- পাওয়ার ব্যাংক নিও। আমার সিমে নেটওয়ার্ক প্রায় ছিলই না, আর বিদ্যুৎ রাতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকে।
- জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি কয়েকটা রেখো, চেকপোস্টে লাগে।
- যাওয়ার আগে খবর নিয়ে যাও সাজেক খোলা আছে কিনা। নিরাপত্তা বা আবহাওয়ার কারণে মাঝে মাঝে পর্যটন বন্ধ থাকে।